নিদারাবাদের শোকগাথা: শশাঙ্ক দেবনাথ ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ড

🕯️ নিদারাবাদের শোকগাথা: শশাঙ্ক দেবনাথ ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ড

১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামের একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী দরিদ্র মোয়া বিক্রেতা, শশাঙ্ক দেবনাথ, তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান যে তিনি গুড় আনতে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবেন বলে জানালেও তিনি আর ফিরে আসেননি।

তিনি পূর্বপরিচিত ব্যক্তি তাজুল ইসলামের ডাকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ঘণ্টা, দিন, মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বহুবার শশাঙ্কের স্ত্রী, বিরজাবালা, তাজুলের কাছে স্বামীর খোঁজ চাইলেও তিনি কেবল জানান যে শশাঙ্ক জমি বিক্রি করে ভারতে চলে গেছেন। শেষমেশ, বিরজাবালা বাধ্য হয়ে আদালতে তাজুলের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা দায়ের করেন।

এরপর তাজুল ইসলাম একাধিকবার গা-ঢাকা দেন। মামলাটি আদালতে চলমান থাকাকালীন তিনি বিরজাবালাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন, তবে বিরজাবালা ছিলেন অনড়। এই সময়ের মধ্যেই দুই বছর পেরিয়ে যায়।

১৯৮৭ সালের মধ্য অক্টোবরের এক ভোরবেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামের এক দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি, শশাঙ্ক দেবনাথ, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী বিরজাবালাকে জানিয়ে যান—তিনি গুড় আনতে যাচ্ছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরবেন। কিন্তু সেই গমনই ছিল তাঁর শেষ — তিনি আর ফিরেননি।

মূলত, গ্রামবাসীর পরিচিত তাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তাঁকে ডেকে বের করেছিলেন। এরপর শুরু হয় শশাঙ্কের দীর্ঘ অনুপস্থিতি। দিন, সপ্তাহ, মাস গড়ায়, অথচ তাঁর কোনো খোঁজ মেলে না।

বিরজাবালা বারবার তাজুলের কাছে স্বামীর অবস্থান জানতে চাইলে, তাজুল একই উত্তর দিয়ে যান—শশাঙ্ক তাঁর কাছে জমি বিক্রি করে ভারতে চলে গেছেন।

শশাঙ্কের এই রহস্যজনক অন্তর্ধানকে কেন্দ্র করে বিরজাবালা শেষমেশ আদালতের দ্বারস্থ হন। তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা দায়ের করেন, কারণ তিনিই শশাঙ্ককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়েছিলেন।

😠 তাজুলের রহস্যময় ভূমিকা

মামলার সংবাদে তাজুল পুলিশি গ্রেপ্তারের ভয়ে কয়েকবার গ্রাম থেকে পালিয়ে যান। আবারও ফিরে আসেন, আর প্রতিবারই বিরজাবালাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি ও চাপ দিয়ে যান। বিরজাবালা দৃঢ় থাকেন—তিনি এই মামলা কোনোভাবেই তুলে নেবেন না।

দুই বছরের মতো কেটে যায়। মামলার রায় ঘোষণার দিন ঘনিয়ে আসে। আর ঠিক তখনই তাজুল ইসলাম আঁটে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।

🌒 দ্বিতীয় ধাপ: পুরো পরিবার নিখোঁজ

১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক রাতে নিখোঁজ হয়ে যায় শশাঙ্কের গোটা পরিবার—স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান। যারা সবাই ছিলেন সহজসরল ও নিরীহ। পরদিন থেকেই গ্রামজুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে—“শশাঙ্ক যেহেতু আগেই ভারতে চলে গেছে, এবার তাঁর স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে গেছেন।”

অন্যদিকে কিছু স্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেন, শশাঙ্ক তাঁদের কাছে বাড়ি ও জমি বিক্রি করে চলে গেছেন। এমনকি তাজুলও জানান, জমির মালিকানা তাঁর, যেহেতু শশাঙ্ক তা তাঁর নামে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। বিরজাও তা নাকি জানতেন।

এইসব আলোচনার মধ্যেই স্থানীয়দের মধ্যে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে কটূক্তি ছড়িয়ে পড়ে—“এক জমি তিনজনের কাছে বিক্রি করে মালাউন দেশ ছাড়লো!” যদিও সত্য ছিল অনেক গভীর।

⚰️ আবিষ্কৃত হলো সত্য: ড্রামের ভেতরে লাশ!

একদিন বিকেলে ধূপাজুড়ি বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখে স্কুল শিক্ষক আবুল মোবারক সন্দেহ করে মাঝিকে নৌকা ঘুরাতে বলেন। হঠাৎ নৌকা কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুলে ওঠে—মাঝির বৈঠা খটখট শব্দ তোলে। অনুসন্ধানে উঠে আসে একটি ঢাকনাবদ্ধ ড্রাম। ভেতরে প্রবল দুর্গন্ধ।

স্থানীয় চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডেকে আনা হয়। ড্রামের মুখ খুলতেই সবাই স্তব্ধ—তিনটি মৃতদেহ।

অনুসন্ধান আরও চলতে থাকে, এবং পাওয়া যায় দ্বিতীয় ড্রাম, যাতে খণ্ডিত আরও তিনটি মৃতদেহ। মোট ছয়টি লাশ!

যাদেরকে শনাক্ত করা হয়, তারা হলেন—১১ দিন আগে নিখোঁজ হওয়া বিরজাবালা এবং তাঁর পাঁচ সন্তান। কেবল বড় মেয়ে সুনীতিবালা সেসময় শ্বশুরবাড়িতে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।

🕵️‍♂️ পুলিশের তদন্ত ও চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

পুলিশের তদন্তে উঠে আসে—তাজুল ইসলাম প্রথমে শশাঙ্ককে হত্যা করে, পরে জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের এক রাতে তুলে নিয়ে বিলে হত্যার মাধ্যমে গুম করে ফেলেন।

⚖️ আদালতে তাজুলের ভয়ঙ্কর জবানবন্দি

জবানবন্দিতে তাজুল স্বীকার করেন:

“আমি শশাঙ্ক দেবনাথের জমি দখল করতে চেয়েছিলাম। এজন্য বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা করি। পাঁচগাঁও বাজারে আব্দুল হোসেন ও হাবিবকে জানাই যে বিরজাবালাকে হত্যা করতে হবে। আব্দুল হোসেন ৩০ হাজার টাকা চায়, আমি ২০ হাজারে রাজি হই।”

তিনি জানান, কিভাবে ঘটনাপূর্বে টাকা জোগাড় করে সহযোদ্ধাদের প্রস্তুত করেন, নৌকা ভাড়া করেন, ড্রাম, চুন ও লবণ কিনে রাখেন।

“৫ই সেপ্টেম্বর রাতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সবাই আসে। আমি, আব্দুল হোসেন ও কয়েকজন বিরজাবালার ঘরের জানালা শাবল দিয়ে ভেঙে ভিতরে ঢুকি। সবাই ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। আমি ও আব্দুল হোসেন বিরজাবালার মুখ চেপে ধরি এবং বাকিদের নৌকায় তুলে নিয়ে যাই।”

“বিলে গিয়ে, আমি রামদা দিয়ে বিরজাবালার পেটে কোপ দেই। তাঁর মেয়ে নিয়তিকে আব্দুল হোসেন কোপে দ্বিখণ্ডিত করে, ছোট সন্তানদের আলী আজম, ফিরোজ ও অন্যরা দা দিয়ে হত্যা করে।”

লাশগুলো চুন ও লবণসহ ড্রামে ভরে রশি দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

“ঘটনার পর আমি সবাইকে সতর্ক করি, যদি কেউ মুখ খোলে, তাঁর পরিণতি বিরজার মতো হবে।”

🩸 শশাঙ্ক হত্যার স্বীকারোক্তি

জবানবন্দিতে তাজুল বলেন:

“দুই বছর আগে এক শুক্রবার সকালে আমি ও আমার জামাতা ইনু শশাঙ্ককে জানাই তাঁর জামাতা ভারত সীমান্তে অপেক্ষা করছেন। আজিদের বাড়িতে তাঁকে নিয়ে যাই। রাত ১২টায় তাঁকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করি। পরে মৃতদেহ ভারতের চেহরিয়া গ্রামে পরিত্যক্ত ক্যাম্পে ফেলে আসি।”

🧨 গ্রেফতার ও বিচার

সিআইডির এক গোয়েন্দা কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হন—এটাই তাজুল ইসলাম। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞে পুলিশ ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়। তাজুল ও তাঁর সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড হয়।

ফাঁসির দিন গ্রামে উৎসবের মতো উদযাপন হয়। ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ হয়। গ্রামবাসীরা অপরাধীদের লাশ দেখেই থুতু ছোঁড়ে, জুতা ছুঁড়ে।

🎬 চলচ্চিত্র রূপ

এই ভয়ঙ্কর বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে “কাঁদে নিদারাবাদ” নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, যাতে শোক, ঘৃণা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্তম্ভিত প্রতিফলন উঠে এসেছে।

Leave a Reply