কাজি নজরুল ইসলামের আগমনী কবিতার বিশ্লেষণ

কাজি নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা গ্রন্থের কবিতা “আগমনী” মূলত একটি দুর্গা বন্দনামূলক কবিতা, যেখানে মহাবিশ্বের যুদ্ধের চিত্রের সঙ্গে দেবী দুর্গার স্তুতির উপাদান মিশে গিয়েছে। দুর্গা স্তুতিতে সাধারণত দেবীর শক্তি, সাহসিকতা এবং অশুভ শক্তির ওপর বিজয়ের বন্দনা করে, এবং এই কবিতায় সেই মূল ভাবধারা প্রতিফলিত হয়েছে। কবিতায় দুর্গার রক্ষাকারী ও অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার ভূমিকা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
নিচে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটিকে বিশ্লেষণ করা হলো:
 

১. যুদ্ধের চিত্র ও দেবীর যোদ্ধা রূপ

দেবী দুর্গার যোদ্ধা রূপটি দুর্গা স্তুতিতে বারবার বন্দিত হয়, বিশেষ করে মহিষাসুরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের প্রসঙ্গে। কবিতায় যুদ্ধের উদ্দীপনা খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে:
• “এ কী রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন – ঝন রনরনরন ঝনঝন! …… হো হো ঝনন ননন রনঝনঝন রনননরন ঝনরন!”
এখানে যুদ্ধের ও দুর্গা পুজায় ঢাকের আওয়াজ বোঝানো হয়েছে। মধ্যযুগে ও প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাক ও ঢোল জাতীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো। এই পন্তিগুলোর মাঝে যুদ্ধের তীব্র শক্তি অনুভব করা যায়। দুর্গা স্তুতিতে দুর্গাকে প্রায়শই যুদ্ধক্ষেত্রে চিত্রিত করা হয়, যেখানে ঢাক, শঙ্খ এবং অস্ত্রের সংঘর্ষে মহাবিশ্ব মুখরিত হয়ে ওঠে। কবিতার এই শক্তিশালী দৃশ্য ‘মহিষাসুর মর্দিনী স্তোত্র’-এর মতো, যেখানে দেবীকে পৃথিবীকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আহ্বান করা হয়। এটি মহিষাসুর এবং অন্যান্য অসুরদের বিরুদ্ধে দুর্গার অদম্য শক্তির প্রতিফলন ঘটায়, যেভাবে তিনি দুর্গা স্তুতিতে বন্দিত হন।

 

২. দুর্গার মহিষাসুর মর্দিনী রূপের সরাসরি উল্লেখ

দুর্গার মহিষাসুর বধ এক গুরুত্বপূর্ণ থিম দুর্গা স্তুতিতে। এই কবিতায় সরাসরি মহিষাসুরের পরাজয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
• “পদতলে লুটে মহিষাসুর”
এই পংক্তিতে মহিষাসুর মর্দিনী দুর্গার কথা সরাসরি বলা হয়েছে। মহিষাসুরকে দেবীর পায়ের তলায় পদদলিত অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে, যা শুভ শক্তির অশুভের ওপর বিজয়ের প্রতীক। দুর্গা স্তুতিতে দেবীকে মহিষাসুরকে বধ করার জন্য প্রশংসা করা হয়, যা ন্যায়ের চূড়ান্ত বিজয়কে নির্দেশ করে।
 

৩. দুর্গার মহাজাগতিক রক্ষাকারী এবং জগতের মাতৃরূপ

দুর্গা স্তুতিতে দেবীকে বিশ্বজননী ও রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে বন্দনা করা হয়। এই কবিতাতেও একইভাবে তাঁর মাতৃরূপকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে:
• “মহামাতা ওই সিংহাবাহিনী জানায়”
দুর্গাকে এখানে “মহামাতা” (মহান মাতা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাঁর রক্ষাকারী ভূমিকার প্রতিফলন। সিংহের পৃষ্ঠে আরোহিতা (সিংহাবাহিনী) হিসেবে তাঁর চিত্র যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অসীম শক্তির প্রতীক। দুর্গা স্তুতিতে দেবীকে একাধারে মাতৃসুলভ এবং ভয়ঙ্কর রূপে চিত্রিত করা হয়, যা সৃষ্টির ও ধ্বংসের মধ্যে একমাত্র্রিক ভারসাম্যের প্রতীক।
• “আজ রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার”
এই পংক্তিতে দেবীর দ্বৈত রূপ— যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধা দেবী এবং বিশ্বজননী (জগৎমাতা)—প্রতিফলিত হয়েছে। এটি সেই ভাবকে প্রতিফলিত করে যা “যা দেবী সর্বভূতেষু” স্তোত্রে বলা হয়েছে, যেখানে দুর্গাকে সমস্ত প্রাণীর মধ্যে বিরাজমান দেবী হিসেবে আহ্বান করা হয়।
 

৪. অশুভ শক্তির ওপর বিজয় ও ন্যায়ের জয়

দুর্গা স্তুতির আরেকটি সাধারণ থিম হল দেবীর অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে পৃথিবীতে শান্তি এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এই কবিতায়ও দেবীর শক্তির বন্দনা করা হয়েছে:
• “শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!”
এই লাইনটি ঘোষণা করে যে দানবীয় শক্তি চিরস্থায়ী নয় এবং তা দেবীর পদতলে চূর্ণ হয়ে যায়। দুর্গা স্তুতিতে দেবীকে সমস্ত রকমের অসুর শক্তি (দানবীয় শক্তি) ধ্বংস করে মহাবিশ্বে ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের জন্য বন্দনা করা হয়।
• “নাই দানব, নাই অসুর– চাইনে সুর চাই মানব!”
এখানে এমন এক বিশ্বকল্পনা করা হয়েছে যেখানে দানব ও দেবতার চেয়ে মানবতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেবী তাঁর মহাশক্তি দিয়ে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করেন, যা দুর্গা স্তুতিতে তাঁর রক্ষাকারী এবং দয়ালু মায়ের ভূমিকা প্রতিফলিত করে।
 

৫. দেবীর অস্ত্র ও মহাজাগতিক ক্ষমতা

দেবী দুর্গাকে প্রায়শই দশ হাতে বিভিন্ন অস্ত্র ধারণ করা অবস্থায় চিত্রিত করা হয়, যা বিভিন্ন দেবতার কাছ থেকে প্রাপ্ত। এই কবিতায় দেবীর অস্ত্র এবং মহাজাগতিক শক্তির প্রতিচ্ছবি দেখা যায়:
• “দশদিকে তাঁর দশহাতে বাজে দশ প্রহরণ!”
এই লাইনটি দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্রের কথা উল্লেখ করছে, যা দেবীর ঐতিহ্যবাহী প্রতিকৃতিতে দেখা যায়। দুর্গা স্তুতিতে এই অস্ত্রগুলি দেবীর শক্তির প্রতীক, যা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধকে নির্দেশ করে।
• “বহ্নিঘাত মারের ওপরে মার হানো”
আগুন এবং ক্রমাগত আঘাতের চিত্র মহাবিশ্বের যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্গার ক্রমাগত শক্তি প্রতিফলিত করে। দুর্গা স্তুতিতে দেবীকে প্রায়শই তাঁর অমিত ক্রোধের প্রকাশ ঘটিয়ে অসুরদের বধ করতে বলা হয়।

 

৬. মহাজাগতিক এবং দৈব শক্তি

দুর্গা স্তুতিতে দেবীর মহাজাগতিক এবং প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা দেখা যায়। নজরুলও তাঁর কবিতায় শক্তিশালী প্রাকৃতিক চিত্র ব্যবহার করেছেন:
• “যম বরুণ কী কলকল্লোলে চলে উতরোলে ধ্বংসে মাতিয়া”
যম (মৃত্যুর দেবতা) এবং বরুণ (জলের দেবতা)-এর উল্লেখের সঙ্গে ধ্বংসের চিত্র দেবীর মহাজাগতিক উপাদানগুলির নিয়ন্ত্রণকে প্রতিফলিত করে। বহু স্তুতিতে দেবীকে মহাজাগতিক শক্তির মূল উৎস হিসেবে আহ্বান করা হয়।
• “প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল”
ত্রিকালের (অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ) প্রলয়ের নৃত্য প্রতিফলিত করে, যা দেবীর ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রকাশ। দুর্গা স্তুতিতে দেবীকে আদিশক্তি হিসেবে বন্দনা করা হয়, যিনি সৃষ্টি, সংরক্ষণ এবং ধ্বংসের নিয়ন্ত্রক।
 

৭. যুদ্ধের পর শান্তি ও কল্যাণ

দুর্গা স্তুতির শেষ অংশে সাধারণত যুদ্ধের পর দেবীর শান্তিপূর্ণ রূপের বন্দনা করা হয়। এই কবিতাতেও যুদ্ধের শেষে শান্তির আহ্বান স্পষ্ট:
• “শান্ত মন, ক্ষান্ত রণ! খোল তোরণ, চল বরণ করব মায়;”
এই অংশে যুদ্ধের পর দেবীর পূজা করার আহ্বান করা হয়েছে। দুর্গা স্তুতিতে যুদ্ধের পরে দেবীর শান্তিময় রূপের আহ্বান করা হয়, যেখানে তিনি পৃথিবীকে শান্তি এবং সমৃদ্ধি দিয়ে আশীর্বাদ করেন।
• “ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক মা-র আবাহন-গীত চলুক!”
এখানে মায়ের আগমন উপলক্ষে প্রদীপ জ্বালানো এবং সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শান্তির বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে। দুর্গা পূজার সমাপ্তির পর দেবীর শান্তিময় প্রস্থান এবং ভক্তদের প্রতি আশীর্বাদের প্রতীক এটি।
 

উপসংহার

নজরুলের “আগমনী” কবিতায় দুর্গা স্তুতির ভাবধারা স্পষ্ট। যুদ্ধের চিত্র, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মহাজাগতিক রক্ষার থিমগুলি ফুটে উঠেছে। প্রতিটি লাইনেই দেবীর মহিষাসুর বধের মিথকথা এবং তাঁর শক্তির বন্দনা প্রতিফলিত হয়েছে।

Leave a Reply